মহানবী (সা.)-এর ব্যাবসায়িক উদ্যোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৫, ২০২১
  • 12 পড়া হয়েছে
মহানবী (সা.)-এর ব্যাবসায়িক উদ্যোগ
মহানবী (সা.)-এর ব্যাবসায়িক উদ্যোগ

যে জীবন মানুষকে অভিভূত করে, যে জীবন সব মানবের কল্যাণে সর্বাবস্থার জন্য নিয়োজিত, সে জীবনের একটি মনোজ্ঞ আলেখ্য আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। মহানবী (সা.) মানুষকে শুধু একত্মবাদ ও ইবাদত-বন্দেগীর প্রতিই উৎসাহ দেননি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিও তিনি সমান গুরুত্বারোপ করেছেন।

মহানবী (সা.)-এর জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম ছিল ব্যবসা। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। দাদা আব্দুল মুত্তালিবও ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু জীবনের শেষদিকে আব্দুল মুত্তালিবের ধন-সম্পদের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। যার কারণে তাঁর মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া সম্পদ ছেলেদের মধ্যে বণ্টনের পর অন্যদের মতো চাচা আবু তালিবের ভাগেও খুব বেশি পরিমাণ সম্পদ ছিল না। আর বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বভারও ছিল তাঁর ওপর। সেহেতু বালক মুহাম্মদ (সা.) কৈশোরের দুরন্তপনার দিনগুলোতেই পারিবারিক অর্থনৈতিক চাকা ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে পিতৃব্যের মেষ পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মহানবী (সা.) কিশোর বয়সেই চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমন করেন। এটাই তাঁঁর জীবনে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। সে সফরে বিচিত্র অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং সৃষ্টি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য তাঁর হৃদয়ে স্থান করে নেয়। সে অভিজ্ঞতা নিয়ে যৌবনে উপনীত হওয়ার পর মেষ চরানো এবং ব্যবসার মাধ্যমে শুরু হয় মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক জীবন। ঁতাঁর ব্যাবসায়িক সুনাম ও সততা তাঁকে এনে দিয়েছিল ‘আল-আমিন’ উপাধি, যার পরিপ্রেক্ষিতেই খাদিজা (রা.) তাঁকে প্রথমত ব্যাবসায়িক অংশিদার ও দ্বিতীয়ত স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন ধনবতী ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি তাঁর পুঁজি দিয়ে লাভ-ক্ষতির অংশীদানভিত্তিক যৌথ ব্যবসা করতেন। খাদিজা (রা.) মহানবীর (সা.)-এর সততা ও উত্তম চরিত্রের কথা জানতে পেরে তাঁকে পুঁজি নিয়ে সিরিয়ায় ব্যাবসায়িক সফরে যাওয়ার জন্য আবেদন জানালেন। মহানবী (সা.) তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদিজার ক্রীতদাস ‘মায়সারাহ’র সঙ্গে সিরিয়ার পথে বাণিজ্যিক সফরে বের হলেন। বিগত সফরগুলোর তুলনায় এবার সফরে দ্বিগুণ লাভ হলো।

মায়সারাহ খাদিজার কাছে রাসুল (সা.)-এর বিশ্বস্ততা ও মহান চরিত্রের বর্ণনা দিলেন। খাদিজা (রা.) রাসুল (সা.)-এর বাণিজ্যিক দক্ষতা ও সততার চিহ্ন দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি তাঁর বান্ধবী ‘নাফিসাহ’র মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। রাসুল (সা.) এ ব্যাপারে তাঁর চাচাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলে তাঁরা বিয়ে সম্পন্ন করে দিলেন।

খাদিজার সঙ্গে বিয়ের পর আস্তে আস্তে তিনি বাণিজ্য নগরী মক্কার সর্বাধিক পুঁজিপতি ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন।

মহানবী (সা.) নবুওয়াতের আগে পার্টনারশিপের ব্যবসাও করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে সাইফ বলেন, আমি জাহেলি যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাবসায়িক পার্টনার ছিলাম। এরপর যখন মদিনায় পৌঁছলাম, তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে চিনতে পেরেছেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আপনি আমার ব্যাবসায়িক পার্টনার ছিলেন, অত্যন্ত উত্তম পার্টনার, যে কোনোরূপ প্রতারণা করেনি আর বিবাদও করেনি।

নবুওয়াতের গুরুদায়িত্ব প্রাপ্তির পর রাসুল (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না। তথাপি তাঁর নিজস্ব ও খাদিজা (রা.) থেকে প্রাপ্ত পুঁজি দ্বারা নতুন ইসলামের প্রচার করতে লাগলেন। নওমুসলিম সাহাবিগণের মধ্যে যাঁরা সামর্থ্যহীন, তাঁদের খরচাদি রাসুল (সা.) নিজেই বহন করেছিলেন।

হিজরতের পর মুহাজির-আনসার সবার জীবনপ্রবাহকে তিনি আগাগোড়া পাল্টে দিয়েছিলেন। তিনি সাহাবিদের শ্রমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করলেন।

হিজরত ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন এবং তথায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থনৈতিক কাঠামো রচনার পটভূমি। মক্কায় মুসলমানদের অর্থনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ ছিল না। মদিনায় মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে তিনি পারস্পরিক যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে দিয়েছিলেন, সেটিই ছিল মদিনার অর্থনৈতিক বিপ্লবের মূল চাবিকাঠি। সহায়সম্বলহীন মুহাজিরগণ মদিনার আনসারদের ভূমিগুলো চাষাবাদে ভরপুর করে তোলেন। একে একে গড়ে তোলেন নানা বাজার ঘাট আর নতুন নতুন কারিগরি প্রতিষ্ঠান।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাসুল (সা.) যে অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন তা নিম্নোক্ত মূল নীতিসমূহের অন্তর্ভুক্ত। যথা— (এক) সেবামূলক কার্যক্রম, (দুই) মধ্যস্বত্বভোগ সীমাবদ্ধকরণ এবং সুদকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধকরণ, (তিন) ব্যক্তি মালিকানার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় সাধন, (চার) সাম্যের নীতি প্রতিষ্ঠাকরণ।

প্রিয় পাঠক, নবীর আদর্শকে সামনে রেখে আজও যদি আমরা সেবা, সততা, দায়িত্ববোধ আর সাম্যনীতির আলোকে ব্যাবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করি তাহলে নিজ অর্থনীতির প্রবাহ উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাধিত হবে সামাজিক উন্নয়ন। আসুন সবাই ব্যাবসায়িক জীবনে নবীর আদর্শকে রোলমডেল হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

Please Share This Post in Your Social Media

এই বিভাগের আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *