কিশোর গ্যাংয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড, রাজধানী দাপাচ্ছে ৩৪টি গ্রুপ

অপরাধ সাম্রাজ্য নিজেদের দখলে রাখতে ‘কিশোর গ্যাং’-এর দিকে ঝুঁকছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা। আর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আসকারা পেয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ এখন বেপরোয়া। কোনোভাবেই তাদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক লোমহর্ষক খুনখারাবির ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের জড়িত থাকার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের।

গোয়েন্দারা কেবল রাজধানীতেই ৬০টি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয় রয়েছে ৩৪টি গ্রুপ। মহল্লা-বস্তির ছিঁচকে সন্ত্রাসী থেকে ধনাঢ্য পরিবারের ধনীর দুলালদের সমন্বয়ে গড়া বেশ কিছু গ্যাংয়ের সদস্যদের কাছে এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে দেশি-বিদেশি অস্ত্র। মাঝেমধ্যেই গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে অন্য এলাকাতেও মহড়া দিচ্ছে বলে খবর রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোর হওয়ার কারণে দণ্ডবিধিতে পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ১৮ বছর পর্যন্ত বয়সের কেউ অপরাধ করলে তাকে দণ্ডবিধিতে কোনো বিচারকার্য সম্পাদন করা যাবে না। তাদের আটক করে শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠাতে হয়। অথচ ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়সে কিশোর হওয়ার সুবাধে শাস্তির আওতায় আনতে আইনের যথেষ্ট ফাঁকফোকর থাকায় এর সুযোগ নিচ্ছে এসব গ্যাংয়ের লিডারসহ বাকি সদস্যরা। অনেক বড় বড় অপরাধ ঘটিয়েও বয়সের অজুহাতে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে জামিনে বের হওয়ার সুযোগ। জামিনে বাইরে এসে এরা আবারও জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। তবে অভিভাবকদের উচিত হবে তাদের সন্তানদের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মাহবুব আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে অনেক কিশোর গ্যাং তৎপরতা চালাচ্ছে এমন খবর আমরা পাচ্ছি। তবে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক কিশোর অপরাধীকে আমরা গ্রেফতার করেছি। এসব বিষয়ে পরিবার এবং সামাজিকভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

২০১৭ সালে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর খুনের পর থেকেই কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরে আসে। পরবর্তীতে লাগাতার অভিযানে ঢাকায় গজিয়ে ওঠা অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাংয়ের ৫ শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-পুলিশ। মাঝে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও বর্তমানে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা আবারও মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে। গত ২৭ আগস্ট রাতে এক রিকশাওয়ালাকে বকাঝকা করার বিষয়ে প্রতিবাদ করায় উত্তরখান রাজাবাড়ি খ্রিস্টানপাড়া এলাকায় মো. সোহাগ নামে এক যুবককে খুন করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। ৩০ আগস্ট বকশীবাজার মোড়ে নয়ন আহমেদ নাজিম নামের এক যুবককে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে খুন করে ১৫/২০ জন যুবক। একই দিন লালবাগ কেল্লার সমানে বাপ্পীকে ১৫/২০ জন যুবক ছুরিকাঘাত করে। বাপ্পী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সড়কে এক পথযাত্রীকে অস্ত্র দিয়ে মারধর করে রক্তাক্ত জখম, চুরি ও হুমকির অভিযোগে গত ৩ আগস্ট সহযোগী নাজমুলসহ আলোচিত-সমালোচিত বাংলাদেশি টিকটকার ইয়াসিন আরাফাত অপু ওরফে ‘টিকটক অপু’ ওরফে ‘অপু ভাইকে’ গ্রেফতার করে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ। মারধরের ঘটনায় সে গ্রেফতার হলেও টিকটক অপুর বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং তৈরির প্রচেষ্টা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ভিকারননিসা নূন স্কুলের এক ছাত্রীকে দফায় দফায় অপহরণ করলেও এর প্রতিকার না হওয়ায় আতঙ্কে ভুগছেন চকবাজার এলাকার বাসিন্দারা। গ্যাং লিডার সাদিক আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ওই ছাত্রীকে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দফায় অপহরণ করা হয়। প্রতিবারই পুলিশ ওই ছাত্রীকে উদ্ধারসহ গ্যাং লিডার সাদিক আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করে। অতি সম্প্রতি সাদিক জামিনে বের হয়ে পুনরায় তার সহযোগীদের দিয়ে প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারকে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ছাত্রীর নোংরা ছবি ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রীর অসহায় বাবা মো. মূসা।

গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদ হাউজিংয়ের পাইওনিয়ার গলিতে কিশোর গ্যাং ‘আতঙ্ক’ গ্রুপের হাতে খুন হয় ‘ফিল্ম ঝিরঝির’ গ্রুপের সদস্য স্কুলছাত্র মহসিন (১৬)। তাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয় সহপাঠী সাব্বির (১৭) ও রাকিব (১৭)। এই খুনের দুই দিন পর কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধে রাজধানীর হাতিরঝিল থানার বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড দিয়ে ১১২ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। জব্দ করা হয় ছয়টি মোটরসাইকেল। এখন আবার পুরনো চিত্র ফিরেছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, শুধু রাজধানীতেই ৬০টি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ গ্রুপই সক্রিয়। এই ৩৪টি গ্রুপের সদস্যরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কারাবন্দী টেন্ডার মাফিয়া জি কে শামীমের হয়ে মাঠ গোছানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন রানা মোল্লা নামের এক ব্যক্তি। ক্রীড়া পরিষদ ও পিডব্লিউডি, সেগুন বাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি যুবলীগ নেতা পরিচয়ে টাঙ্গিয়েছেন ফেস্টুন। এরই মধ্যে নেপথ্য থেকে কিশোর গ্যাংয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন কেরানীগঞ্জের ওসমান, বাবু, হৃদয়, রাসেল, ইমন, শরীফকে।

বিদেশ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য যে কোনো মূল্যে ধরে রাখতে কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এরই মধ্যে রামপুরা, শাহজাহানপুর, খিলগাঁওভিত্তিক অন্তত তিনটি গ্যাং তৈরি করেছেন। দেশে তার হয়ে সব কিছু দেখভাল করছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী তানভীর, উজ্জ্বল, কাওসার, আশিক ও বাবু। ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, ঝিগাতলা, কলাবাগান, আজিমপুর এলাকায় নিজের নিয়ন্ত্রণ একচ্ছত্র রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন কারাবন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। এলাকায় ইমনের বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করেন হেজ্জাজ বিন আলম, জিতু, মুন্না, মিলন। তবে অস্ত্রের বিষয়টি দেখভাল করেন মুন্না। এ ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি দেখভাল করছেন তপু, জিগাতলা নতুন রাস্তার ভাগ্না রনি, মিতালী রোডের রুবেল, ধানমন্ডির তাহাজ্জিব, বাস্টার্ড সেলিম।

গত বছর কিশোর গ্যাং বাংলা গ্রুপের এক সদস্যকে লাভলেইন গ্রুপের সদস্যরা খুন করার পরই গোয়েন্দারা জানতে পারেন ইমনের কিশোর গ্যাংয়ে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি। একই অবস্থা মিরপুর, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, উত্তরা এলাকায়। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদত এবং জামিল অপরাধ জগতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে কিশোর গ্যাংয়ের মদদ দিচ্ছেন। বখে যাওয়া তরুণদের বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের দলে টানছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।