কেন পুড়ছে পৃথিবীর ‘ফুসফুস’ আমাজন ? নেপথ্যে কি...

আমাজন পৃথিবীর বৃহত্তম অরণ্য যা প্রতিনিয়ত প্রচুর কার্বন শুষে নেয়।এই অরণ্য বিশ্ব বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে ও বিশ্ব বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করে থাকে বলে একে পৃথিবীর ‘ফুসফুস বলা হয়।

হরেক রকম জীব বৈচিত্র্যের বসবাস এই আমাজনে।প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি প্রজাতির গাছপালা-বন্যপ্রাণী ও দশ লাখেরও বেশি আদিবাসী আছে এখানে।এর বেশিরভাগ এলাকাই ব্রাজিলে অবস্থিত।

বর্তমানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আগুনে জ্বলছে আমাজন।শুষ্ক মৌসুমে প্রায়ই ব্রাজিলে দাবানলের ঘটনা ঘটে।কিন্তু এবার ভয়ংকর দাবনলে পুড়ছে আমাজন।যে অরণ্য পৃথিবীর মোট অক্সিজেন-চাহিদার ২০ শতাংশ জোগায় তা এভাবে পুড়লে পৃথিবীর জলবায়ু মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হবে।

ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ এর মতে, চলতি বছরে ৭৫ হাজারেরও বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে এবং তার বেশিরভাগই ঘটেছে আমাজন অঞ্চলে।যাকে ‘আন্তর্জাতিক সংকট’ বলে অভিহিত করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রো।

আগুন লাগার পিছনে কারন কি জানতে চাইলে পরিবেশবিদসহ বিশ্লেষকরা বলেছেন, অবৈধ উপায়ে নজিরবিহীনভাবে সোনার খনির খোঁজ করাই অ্যামাজনে আগুন লাগার পেছনে দায়ী। আমাজনের ২৪৫টি এলাকায় ২ হাজার ৩১২টি অবৈধ খনি রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রাজিলের অ্যামাজন সোশিও-এনভায়রনমেন্টাল।

এ সব খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলনের লোভে ও এর বাণিজ্য বিস্তারে আদিবাসীদের জমি দখল করে অ্যামাজনের গাছ কেটে, নদী দূষণ করে এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হচ্ছে।

অবৈধভাবে খনি খননকারী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বলেন, ব্রাজিল সরকারের নিষ্ক্রিয় আইন ও দুর্বল প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মূল্যের গুঞ্জনে আমাজনে এখন অবৈধ উপায়ে নজিরবিহীনভাবে সোনার খনির খোঁজ করছেন স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। হাজার হাজার অবৈধ খনির সন্ধানকারীরা সোনার খোঁজে খনন কাজ পরিচালনা করছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক রিপোর্টে প্রকাশ, ব্রাজিলের ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জার বোলসোনারো নির্বাচনের আগে সংরক্ষিত আদিবাসীদের এলাকায় খনি খনন কাজকে বৈধ করার কথা দিয়েছিলেন।তিনি খনি খনন ও খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ আদিবাসীদের ভূমি আইনের মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দেয়ার অঙ্গীকার করেন।

এর প্রেক্ষিতে দ্রুত সাবাড় হচ্ছে বন, আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে।দূষিত হয়ে পড়ছে বনের নদীগুলো। ট্যাপাজোস নদীর পানি কমলা বর্ণ ধারণ করেছে।ব্রাজিল ভূখণ্ডাধীন চিরহরিৎ এই বনাঞ্চলের বিভিন্নস্থানে সাড়ে ৪০০-এর বেশি অবৈধ খনি খনন স্থাপনা রয়েছে বলে জানান, দেশটির সংস্থা অ্যামাজ জিও রেফারেন্সড সোসিও-এনভায়রনমেন্টাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক।

ফলে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট বলসোনারো আগুন নেভাতে আমাজনে প্রায় ৪৪ হাজার সৈন্য পাঠিয়েছেন।

ব্রাজিলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, প্রায় ৪৪ হাজার সৈন্য আমাজনের আগুন নেভাতে কাজ করবে। সাতটি রাজ্যে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের বিষয়টিও অনুমোদন করা হয়েছে, ব্যবহার করা হচ্ছে যুদ্ধবিমানও।

উল্লেখ্য, দেশটির কংগ্রেসের কাছে হস্তান্তর করা এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বছরে অনন্ত ৩০ টন স্বর্ণ অবৈধভাবে কেনাবেচা হয় অ্যামাজনে।বৈধ উপায়ে অ্যামাজনের জঙ্গলে প্রতিবছর যে পরিমাণ স্বর্ণ কেনা-বেচা হয়,তার চেয়ে ছয় গুণ (এক দশমিক এক বিলিয়ন ডলার) বেশি হয় অবৈধভাবে।হাজার হাজার অবৈধ সোনার খনি খননে আমাজন উজাড় হচ্ছে বন ।

এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে পরিবেশের,শংকটে পড়বে বৈশ্বিক জলবায়ু এমনটাই ধারণা করছেন পরিশেবিদ বিশ্লেষকরা।