ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জেলা গাজীপুরের উন্নয়নে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা : গনি মিয়া বাবুল

ইতিহাস -ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ সবুজ শ্যামলে অরণ্যশোভিত প্রাচুর্যময় জেলা গাজীপুর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বর্তমানে এটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে এই জেলার অবস্থান। গাজীপুর জেলার আয়তন ১৭৪১.৫৩ বর্গ কিলোমিটার । বর্তমানে এই জেলার লোকসংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। গাজীপুর সদর শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর ও কালীগঞ্জ এই পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গাজীপুর জেলা গঠিত। ১৯৮৪ সালে ১ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীয়করণের আওতায় ভাওয়াল পরপগণার একচ্ছত্র শাসক গাজীদের নামানুসারে জেলার নামকরণ করা হয় গাজীপুর।

 গাজীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। সারা ভারতবর্ষে খ্যাতির শিখড়ে স্থান করে নিয়েছে গাজীপুরের কালজয়ী ইতিহাস ঐতিহ্য। গাজীপুরে রয়েছে গাজীদের গৌরবগাঁথা ইতিহাস, হিন্দু রাজাদের রহস্যময় কাহিনী, আছে চেদী রাজ্যের পাঁচ রাজার রাজধানীর ইতিহাস, ঈশা খাঁ ও মান সিংহের যুদ্ধের কাহিনী, সমৃদ্ধ জনপদ ও পাল বংশীয় শাসক শশীপালের রাজধানী, সম্রাট আকবরের প্রেরিত সেনাপতি শাহবাজ খানের সাথে ঈষা খাঁর বানার নদীর যুদ্ধের ঘটনা, ইলিয়াস শাহ নির্মিত একডালা দূর্গ-যেখানে দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক দু-দু বার প্রায় লাখ খানেক সৈন্য নিয়ে এসেও জয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। আরো রয়েছে বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় উৎপাদনের গৌরব ও অনেক পুরাকীর্তি।

ভাষা- সংস্কৃতি ও শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রেও গাজীপুরের ইতিহাস ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে রয়েছে। আঠার শতকের ত্রিশের দশকে ভাওয়ালের নাগরীতে গীর্জায় বসে পর্তুগীজ পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্যা আসসুস্পসাঁউ রচনা করে ছিলেন বাংলার এক দ্বি-ভাষিক অভিধান ও খন্ডিত ব্যাকরণ, যা তৎকালীন সময়ের সর্বপ্রথম বাংলা ভাষা অভিধান। বাংলার গদ্যের জন্মস্থান ও এই ভাওয়াল পরগণা। বাংলা ভাষার ইতিহাসে আদি ও প্রথম গদ্যে প্রথম রচিত পুস্তকটি ‘ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক’ সংবাদ নামে বিশেষ পরিচিত। এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, বিজ্ঞানী ও গবেষক ড. এখলাছ উদ্দিন ও অধ্যাপক ড. অজিত কুমার সাহা। সাহিত্য ও শিল্পের কল্পনাপ্রসূত বোধের বাস্তব রূপদানকারী নাট্যকার ও অভিনেতা ঢাকা যাদুঘরের সংগ্রাহক ও বিশ্বখ্যাত বলদা গার্ডেনের নিমার্তা জমিদার নরেন্দ্র রায় চৌধুরী, স্বভাব কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাস, সু-সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন, পল্লীগীতি গায়িকা মীনা বড়–য়া, কৃতি খেলোয়ার শতাধিক স্বর্ণপদকের অধিকারী মো. কুদরত উল্লাহ এই জেলারই সন্তান।

ঐতিহ্যবাহী এ জনপদের রয়েছে হাজার বছরের নিজস্ব সংস্কৃতি বহু কাল পূর্ব হতে এ অঞ্চলে গাজীর গীত, মেঘ মালার গান, ধান কাটার গীত, ভাওয়াল সঙ্গীত, জারি-সারি-ভাওয়াইয়া গান, পালা গান, যাত্রা গান, ছেলে ভোলানো ছড়া, পূঁতি পাঠের আসর, বিভিন্ন পূজা-পার্বনে বিভিন্ন ধরনের উৎসব ও মেলা আয়োজন ঐতিহ্যগতভাবে শত শত বছর যাবত এই জনপদে টিকে আছে।

গাজীপুরের প্রধান ঐতিহ্য শাল-গজারি বন। অতীতে এ শালবন বাঘের এক বিশাল অভয়াশ্রম ছিল। কথিত আছে, দিল্লীতে সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত তাজমহলের সিঁড়ি তৈরির কাজে শাল কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। মোগল আমলে এই শাল গাছের কষ হতে তৈরি প্রাকৃতিক ধূপ সমস্ত ভারতবর্ষে যোগান দেয়া হতো। মোঘল সুবাদার শাহসুজা, যুবরাজ আকিকমুশ্বানও সুবাদার মুর্শিদকুলি খানের মতো দুঃসাহসিক বীরদের শিকার ভূমি ছিলো ভাওয়াল গড়ের শাল-গজারি গভীর অরণ্য। সুবাদার ইসলাম খান এ অরণ্যে শিকার করতে এসেই প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা যায়। মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের বিষয় বিবেচনা করে ১৯৭৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ভাওয়ালের শালবনের ৭৬ হাজার একর জমি জুড়ে বিশ্বের অনন্য আদলে গড়ে তুলেছেন এক বিশাল পার্ক যা ‘ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্ক’ নামে পরিচিত।

গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী শালবনকে ঘিরে জয়দেবপুরের পিরুজালী মৌজায় ২০১৩ সালে ৩ হাজার ছয় শত নব্বই একর বন ভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। সেখানে সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক, চিতা, হরিণসহ অনেক বন্য পশু-পাখিরা অবাধে বিচরণের সুযোগ পাচ্ছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির গৌরব-অহংকারের মহিমান্বিত একটি অধ্যায়। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গাজীপুরের বীরজনতার ভূমিকা অত্যান্ত গৌরবোজ্জ্বল।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর দেশ স্বাধীন ও মুক্তির আন্দোলনে উত্তাল হতে শুরু করে। মার্চের প্রথম দিকে জয়দেবপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় মুক্তির সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে বীর জনতার প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। এই সশস্ত্র প্রতিরোধে পাকিস্তান সৈনিকদের গুলিতে মনু খলিফা, হুরমত, নিয়ামত ও কানু মিয়া শাহাদাৎ বরণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে এটাই ছিল বাঙালি জনতার প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ। এই দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব দ্বিতীয় ইষ্ট রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করতে গাজীপুরে আসছে, এ কথা শুনে গাজীপুরের জনগণ সড়কে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে। এই সময় বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব ঢাকা ফেরার পথে গাজীপুরের বিক্ষুপ্ত জনগণের বাধার সম্মুখীন হন। ফলে গাজীপুরের বীর জনতা ও পাকিস্তানি সৈনিদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এই খবর দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং সারা বাংলায় শ্লোগান উঠে “জয়দেবপুরের পথ ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন কর”। যা মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁরই নির্দেশে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক এমপি এর নেতৃত্বে ১৯ মার্চ গাজীপুরের বীর জনতা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেছিলো।

মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হককে স্বাধীনতা পদক ২০১৯ এ ভুষিত করা হয়েছে। এই জন্যে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আমরা অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্রে পাক বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে এদেশে গণহত্যা চালায়, শুরু হয় সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যে ব্যক্তিটি চরম প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রজ্ঞা রাজনৈতিক দুরদর্শীতার মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধ সফলভাবে চালিয়ে যান, সেই ব্যক্তিটি গাজীপুরেরই কৃতিসন্তান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমেদ। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতীক। ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর তাকেসহ জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দীর্ঘ ৪৪ বছর পর আজোও এই হত্যাকান্ডের খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ১৬ই মার্চ গাজীপুর জেলাকে বিশেষ শ্রেণীর জেলা হিসাবে ঘোষণা করেন। ২০১৩ সালে গাজীপুর, টঙ্গী পৌরসভার ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠন করা হয় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (জিসিসি)।

রাজধানী ঢাকা মহানগরীর কোলঘেঁষা গাজীপুর জেলা আরও নানাবিধ কারণে প্রসিদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ। এই জেলা রয়েছে অনেকগুলো জাতীয় পর্যায়ের ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমী, বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা আঞ্চলিক কেন্দ্র, তুলা গবেষণা প্রশিক্ষণ ও বীজ বর্ধন খামার, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, টেলিফোন শিল্প সংস্থা তন্মমধ্যে উল্লেখযোগ্য । এই উপমহাদেশের আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর হাই সিকিউসিটি কেন্দ্রীয় কারাগার গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুরে উপস্থিত।

শিল্প ও জ্ঞানের আলো বিস্তারের কেন্দ্রভূমিরূপে গাজীপুরের অবস্থান এক অনন্য উচ্চতায়। ছাত্র সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুরের বোর্ড বাজারে অবস্থিত। এই বোর্ড বাজার এলাকায় আন্তর্জাতিক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ (আইইউটি), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট অবস্থিত। এছাড়া এ গাজীপুরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, টেলিকম স্টাফ কলেজ, আইটি পার্ক, দেশের একমাত্র ডাক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রোভার ও স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গাজীপুরে অবস্থিত।

খুবই দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতিতে ও ইতিহাস-ঐতিয্যে গৌরবোজ্জ্বল অবদান থাকার পরও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৮ বছরেও প্রত্যাশা অনুযায়ী গাজীপুর জেলার উন্নয়ন হয়নি।
নানা কারণে এই জেলার উন্নয়ন অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। যথাঃ

* গাজীপুরের বীর জনতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত বিধায় স্বাধীনতার পর প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে এই এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘদিন  বিপরীত আদর্শের লোকজন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় গাজীপুরের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি।
* সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে গাজীপুরে আধুনিক শহর গড়ে উঠেনি।
* সরকারের যথাযথ তদারকির অভাবে বাড়ি ঘর নির্মাণে বিল্ডিং কোর্ট ও প্রচলিত আইন মানা হয়নি।
* অসাধু কতিপয় ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে জেলার বনায়নসহ নানা ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।
* ভৌগলিক কারণে এই জেলার উপর দিয়ে দেশের প্রায় ৩২ জেলার লোকজন যাতায়াত করে, কিন্তু সড়ক-মহাসড়ক অপ্রতুল ও অপ্রশস্ত হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ হতাহত হচ্ছে।
* জেলার কৃষি জমি সংরক্ষণে উদ্যোগ না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে শিল্প কারখানা তৈরী করায় এলাকার পরিবেশ দুষণ হচ্ছে।
* এলাকা দ্রুত শিল্পায়ন হওয়ার কারণে অপরিকল্পিতভাবে বসতিস্থাপনসহ নানা কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
* কল-কারখানার দূষিত বর্জ্যে এলাকার পরিবেশ দূষণের ফলে মানুষ চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
* খেলাধূলা ও সাংস্কৃতির চর্চার অভাবে এলাকায় তরুণরা মাদকাসক্ত হয়ে ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে।
* মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের সড়কগুলো দীর্ঘদিন যাবত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
* সম্প্রতি সরকার একটি সরকারি মেডিকেল হাসপাতাল স্থাপন করলেও জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনো সন্তোষজনক না।
* ভূ-গর্ভস্থ পানির যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতক দুর্যোগসহ নানা সমস্যা তৈরী হতে পারে।
* নদী, জলাশয় ও পুকুরগুলো সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। এতে পরিবেশ দূষণসহ নানা সমস্যা তৈরী হয়েছে।

নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর এই দশ বছরে সারা দেশের ন্যায় গাজীপুর এলাকাতেও যথেষ্ট উন্নয়ন অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে সরকারের বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা গাজীপুরের উন্নয়নে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সম্প্রতি অনুমোদন করেছেন। ঢাকা থেকে গাজীপুরের যাতায়ত সহজ করতে বিআরটি প্রকল্পের মাধ্যমে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এতে প্রয়োজনীয় ফ্লাইওভার ও ড্রেনেজ সুবিধা থাকবে। এই সকল চলমান কিংবা প্রক্রিয়াধীন উন্নয়ন প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে  প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।  এই ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীদেরকে স্বীয় দায়িত্ব স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহিতা ও দেশপ্রেমের সাথে পালন করতে হবে। সরকারের চলমান প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিম্নোক্ত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

১। গাজীপুর ও তার সন্নিহিত এলাকা সমন্বয়ে একটি আধুনিক সুসম্মত ও সুপরিকল্পিত নগরী এবং আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন গেজেট আকারে প্রকাশ করে অবিলম্বে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।
২। ১৯ মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবসকে জাতীয় দিবস ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করতে হবে।
৩। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবসের মহানায়ক বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হককে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করতে হবে।
৪। ভূ-গর্ভস্থ পানিসহ সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা ও জলাশয় রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৫। গাজীপুরের ভূ-প্রকৃতিক ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৬। পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়নসহ বিল্ডিং কোর্ট অনুসরণ করে বাড়ি ঘর নির্মাণ করতে হবে।
৭। মহাসড়কের সাথে বাইপাস সংযোগ সড়ক তৈরী করতে হবে।
৮। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের চলাচলের অনুপযোগী সড়ক দ্রুত সংস্কার করতে হবে।
৯। সুষ্ঠু পানি সরবরাহ, সংরক্ষণ, পয়ঃপ্রণালী ও পয়ঃপয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১০। শহর এলাকায় ও সড়ক মহা সড়কে সুষ্ঠু যান চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১১। বনায়ন সংরক্ষণসহ নতুন বনায়ন সৃজন করতে হবে।
১২। সুষ্ঠু বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
১৩। জয়দেবপুর চৌরাস্তা ও গাজীপুর শহরে রেল ক্রসিং এর উপর ফ্লাইওভার ব্রীজ নির্মাণ করতে হবে।
১৪। এলাকার কৃষি জমি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
১৫। কলকারখানার দূষিত বর্জ্যে ও পানিতে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে।
১৬। দেশীয় খেলাধূলা ও সাংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে হবে।
১৭। মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অধিকারসহ মানবাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।
১৮। মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
১৯। গাজীপুরে জেলা সদরে ও প্রতি উপজেলাতে শিশুদের বিনোদনের জন্য শিশু পার্ক নির্মাণ করতে হবে।
২০। বাসযোগ্য নিরাপদ গাজীপুর প্রতিষ্ঠা করতে সকলকে স্বীয় দায়িত্ব সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের সাথে পালন করতে হবে।

আধুনিক গাজীপুর প্রতিষ্ঠা করতে জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো উত্তরণের জন্যে গৃহীত প্রকল্পগুলো সততার সাথে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্নয়ন অগ্রগতির জন্যে সরকারের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। স্থানীয় সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনসমূহকে উন্নয়নমূলক কাজে নিজ নিজ দাযিত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

লেখক পরিচিতি ঃ
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কলাম লেখক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক)
উপদেষ্টা, গাজীপুর উন্নয়ন পরিষদ, ঢাকা
সভাপতি, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি